মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব

আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী (রহ)

সংগ্রহে- মনোয়ার হোসেন হিমেল :- যেই ব্যক্তিত্বের মুখে অধিকাংশ সময় শোনা যেত ‘ইন্নামাল আ‘মালু বিল খাওয়াতীম’; ‘শেষ ভাল যার-সব ভাল তার’, অবশেষে তিনিই প্রমাণ করলেন হাদীসের মর্মবাণী ‘মাদফুনে মাক্কী’ হয়ে। ওলিয়ে কামেল হিসেবে যে ভাবে মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের পর ভক্ত-অনুরক্তদের এই ভাব আরো বেশী প্রকাশ পেল। সর্বত্রই একই আলোচনা-‘সত্যিই তিনি ওলিয়ে কামেল’ তাতে কোন সন্দেহ নেই।
জন্ম ঃ সুনামগঞ্জ জেলার দণি সুনামগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী গাজীনগর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ৪ঠা বৈশাখ ১৩৩৫ বাংলা, ২০শে সফর ১৩৪৭ হিজরী মোতাবেক ১৭ই এপ্রিল ১৯২৮ ইংরেজির মঙ্গলবারে তাঁর জন্ম হয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয় আব্দুল হক। পিতার নাম আলহাজ্ব মুন্সি কেরামত আলী ও মাতার নাম মোছাঃ হানিফা বেগম। তিনি দুগ্ধপান কালীন সময়ে মাতৃহারা হন এবং জেলার দিরাই উপজেলার শরীফপুর গ্রামে নানা সোনা মিয়ার বাড়ীতে লালিত-পালিত হন।
প্রাথমিক শিা ঃ মা হারা আব্দুল হক নানার বাড়ী শরীফপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর হঠাৎ দুরারোগ্যে আক্রান্ত হন। এ রোগে তিনি দু’বছর অসুস্থ ছিলেন। একদিন বড়মোহার সূফী সাহেব (রহ) শায়খে গাজীনগরী (রহ)-এর পিতাকে বললেন, আপনি এ ছেলেকে আমার কাছে দিয়ে দেন। এরপর থেকে তিনি তাঁরই সাথে থাকতেন। অত:পর যখন সূফী সাহেব ও পারকুলের হুজুর (রহ) গণের অকান্ত প্রচেষ্টায় দরগাহপুর মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হল, তখন থেকে তিনি এ মাদরাসায় লেখাপড়া করেন।
উচ্চ শিা লাভ ঃ ১৯৪৮ সালে শায়খে গাজীনগরী (রহ) সিলেট আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে কয়েক বৎসর যাবত লেখাপড়া করে জামেয়া ইউনুছিয়া বি-বাড়ীয়ায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি মুতাওয়াসসিতা ৪র্থ বর্ষ থেকে সানবিয়্যাহ ৩য় বর্ষ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। অত:পর উচ্চ শিা লাভের জন্য বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দে গমন করেন। সেখান থেকে ১৩৭৫ হিজরীতে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদীস পরীায় উত্তীর্ণ হন।
অধ্যাপনা ঃ দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে ফেরার পর খলিফায়ে মাদানী ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম (রহ)-এর ডাকে জামেয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় শিকতা শুরু করেন। সেখানে থাকাকালীন কুতবুল আলম, শায়খুল আরব ওয়াল আজম, আওলাদে রাসূল (সাঃ), আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ) একটি চিঠি দিয়ে মাওলানা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরীকে নির্দেশ দিলেন ‘মক্বান যা কর মদরসা কায়েম কর।’ পত্র পাওয়ার পর সেখানে শিকদের সাথে পরামর্শ করলে সকলেই তাঁকে এলাকায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং তিনি এলাকায় এসে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল উলূম দরগাহপুর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমৃত্যু তিনি তাঁর অধ্যাপনা চালিয়ে যান।
পারিবারিক জীবন ঃ পারিবারিক জীবনে হযরত শায়খে গাজীনগরী ২টি বিয়ে করেন। প্রথমটি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের মোছাঃ মুমতাজ বেগমের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম স্ত্রীর ইন্তেকালের পর জেলার দণি সুনামগঞ্জ উপজেলার আস্তুমা গ্রামের মোছাঃ করিমুন নেছার সাথে দ্বিতীয় বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১ম স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানদের মধ্যে ৬ ছেলে ও ৭ মেয়ে। এরমধ্যে ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। তারা হলেন (১) মোঃ আব্দুল্লাহ, (২) মোঃ আব্দুস শহিদ, (৩) মোঃ আব্দুল মুহিত, (৪) মোঃ আব্দুল আযীম, (৫) মোছাঃ জাকিয়া বেগম, (৬) মোছাঃ সাবেতা বেগম। এছাড়া হযরত শায়খে গাজীনগরীর জীবদ্দশায় মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মাওলানা আব্দুল বাসিত (রহ) ইন্তেকাল করেন। বর্তমানে ১ ছেলে ও ৫ মেয়ে জীবিত রয়েছেন। তারা হলেন মাওলানা আব্দুল করীম, (২) মোছাঃ রুকিয়া বেগম, (৩) মোছাঃ যয়নব বেগম, (৪) মোছাঃ ছাইদা বেগম (৫), মোছাঃ খাদিজা বেগম (৬), মোছাঃ সাজিদা বেগম। তারা সকলেই বিবাহিত ও বিবাহিতা।
আধ্যাত্মিক জগতে শায়খে গাজীনগরী ঃ দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসার শিা জীবন সমাপ্ত করে ইলমে তাছাউফের শিা গ্রহণের নিমিত্তে ১৩৭৭ হিজরীতে আওলাদে রাসুল (সা) আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ) যখন ভারতের আসাম প্রদেশের বাশকান্দিতে রমজানুল মোবারকে ইতিকাফ করতে এলেন, হযরত শায়খে গাজীনগরী (রহ)ও সেখানে গেলেন ফুয়ুযাতে মাদানী অর্জন করতে। এ ইতিকাফেই তাঁকে শায়খে মাদানী খিলাফত প্রদান করেন।
সংগ্রামী জীবন ঃ তৎকালীন সময়ে ফিৎনা-ফাসাদ ছিল মহামারীর মতো। সমাজের রন্দ্রে-রন্দ্রে তা প্রবেশ করায় আল্লাহ ভোলা মানুষের সংখ্যাই বেশী ছিল। সামাজিক অবয়সহ নানা কুসংস্কারে জর্জরিত জাতির সামনে পেশ করলেন “জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া হুসাইনিয়া দারুল উলূম দরগাহপুর”। শয়তানের কুমন্ত্রণা পেয়ে কিছু সংখ্যক মানুষ লেগে যায় এর পেছনে। একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে থাকে। সঠিক পথের রাহবার হিসেবে তিনি সকল ঘাত-প্রতিঘাত ডিঙ্গিয়ে তাঁর সংগ্রামী জীবন অব্যাহত রাখেন। চর্তুমুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যে তিনি পিছপা হননি, অটল থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হিসেবে।
রাজনৈতিক জীবন ঃ খলিফায়ে মাদানী আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী মাদফুনে মাক্কী (রহ) তাঁর মুর্শিদের অনুসৃত দল জমিয়তের কার্যক্রম দিয়েই রাজনৈতিক জীবন শুরু করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ইন্তেকালের কয়েক বছর পূর্বে কিছু স্বার্থান্বেষী ও পদলোভী ব্যক্তির কুপ্ররোচনায় পড়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এর কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত হন। দল গঠনের কিছুদিন পর মতা লিপ্সুদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। গঠিত নতুন দলের মুখ থুবড়ে পড়ে কার্যক্রমহীনতায়। শায়খে গাজীনগরীর ইন্তেকালের পর নাম সর্বস্ব দল বিলুপ্ত হয়ে যায়।
সম্মানিত শিকবৃন্দ ঃ হযরত শায়খে গাজীনগরী (রহ)-এর দরগাহপুর মাদরাসায় অধ্যয়নকালীন উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শিকের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন মাওলানা সিকন্দর আলী (রহ) বড়মোহা-সুনামগঞ্জ, যিনি সূফী সাহেব নামে পরিচিত; মাওলানা আব্দুল মুছাব্বির (রহ) পারকুলী-সিলেট, যিনি জমিয়তে উলামার একজন বড় মাপের নেতা ও বিজ্ঞ আলেম ছিলেন; মাওলানা আব্দুস সালাম গাজীনগরী (রহ), দণি সুনামগঞ্জ-সুনামগঞ্জ; মাওলানা মুছদ্দর আলী (রহ) আখাখাজনা, বিয়ানীবাজার-সিলেট, যিনি করীমগঞ্জের হুজুর নামে পরিচিত ছিলেন; মাওলানা ছানা উল্লা (রহ), তিনি ঢাকার হুজুর নামে পরিচিত; মাস্টার আব্দুল গনি (রহ) শ্রীনাথপুর, দণি সুনামগঞ্জ-সুনামগঞ্জ। এছাড়া শরীফপুরে থাকাকালীন সময়ে কায়দা পড়েছেন এমন একজন শিকের নাম পাওয়া যায়। তিনি হলেন আব্দুল খালিক বাঙ্গালগাঁও, দিরাই-সুনামগঞ্জ, যিনি এখনো জীবিত ও একাই চলাফেরা করতে পারেন। অন্যদিকে দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাদগণ হলেন শায়খুল আরব ওয়াল আজম, শায়খুল হাদীস আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ); শায়খুল আদব আল্লামা এজাজ আলী (রহ); আল্লামা ইব্রাহিম বলিয়াভী (রহ); আল্লামা ফখরুল হাসান (রহ); হাকিমুল ইসলাম আল্লামা ক্বারী তৈয়্যিব (রহ) প্রমুখ।
দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ঃ দ্বীনে ইসলামের একনিষ্ঠ খাদেম খলিফায়ে মাদানী আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী (রহ) তাঁর জীবদ্দশায় আল-কোরআন ও আল-হাদীসের প্রকৃত শিা বিস্তারের মহান ল্েয অসংখ্য মাদরাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মাদরাসার নাম হলো সুনামগঞ্জ জেলার দণি সুনামগঞ্জ উপজেলার দারুল উলূম দরগাহপুর, দরগাহপুর মক্তব, দরগাহপুর বালিকা মাদরাসা, পাথারিয়া-শরীফপুর মাদরাসা, জাহানপুর মুসলিম শিশুশিা নূরানী মাদরাসা, দিরাই উপজেলার পঞ্চগ্রাম বদলপুর মাদরাসা, তারাপাশা মাদরাসা, সদর উপজেলার দারুল উলূম মাদানিয়া মাদরাসা, ওয়েজখালী হাফিজিয়া মাদরাসা, ছাতক উপজেলার বড়কাপন ইসলামিয়া মাদরাসা, জামেয়া মুহাম্মদিয়া ভূইগাঁও, শাল্লা উপজেলা সুরমা দারুল কোরআন মাদরাসা, জামালগঞ্জের গজারিয়া মাদরাসা।
শায়খে গাজীনগরীর খলিফাগণ ঃ হযরত শায়খে গাজীনগরীর ৬ জন খলিফা রয়েছেন। তারা হলেন শায়েখ মাওলানা আব্দুল হালীম, কানাইঘাট-সিলেট; শায়েখ মাওলানা কামাল উদ্দিন, বড়লেখা-মৌলভীবাজার; শায়েখ মাওলানা হাদিয়াতুল্লাহ, বি-বাড়ীয়া; শায়েখ মাওলানা মুহিবুর রহমান, ছাতক-সুনামগঞ্জ; শায়েখ মাওলানা নজরুল ইসলাম, গোয়াইনঘাট-সিলেট; শায়েখ হাফিজ মাওলানা ফখরুল ইসলাম সৈয়দপুরী, জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ।
অমূল্যবাণী ঃ শায়খে গাজীনগরী (রহ)-এর অসংখ্য অমূল্যবাণী রয়েছে। তন্মধ্যে এ পর্যন্ত সংগৃহীত বাণী সমূহ পেশ করা হল। (১) কালো কালো হরফে অধ্যয়নের নাম ইলিম হাসিল করা নয়, জেনে বুঝে আমল করার নামই ইলিম। (২) যারা তালিমের সময় উস্তাদের কথা মনযোগ দিয়ে শোনে এবং আমলের নিয়্যাত রাখে, তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা কামিয়াব করেন। (৩) ইলিম শিার আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর মারিফাত হাসিল করা। (৪) যে তালিবে ইলিম কিতাব কাঁধে বহন করতে চায় না, তার দ্বারা আল্লাহ নাপাকী বহন করাইয়া থাকেন। (৫) বড় নৌকার তলায় যদি এক ফুট পরিমাণ ছিদ্র থাকে, ঐ নৌকা বহু মানুষের জন্য সেচে ভাসানো যেমন কঠিন, বেপর্দা মানুষের আমলের তরী ভাসানো তেমনই কঠিন। (৬) বাইম মাছ যেমন মাটির গর্তে বাস করেও গা কে মাটি থেকে বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি মোমিন গোনাহর জগতে বাস করেও গোনাহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। (৭) রুহ না থাকিলে যেমন মানব সন্তান পৃথিবীতে থাকার যোগ্য নয়, তেমনি ঈমান না থাকিলে মানুষ জান্নাত পাবার যোগ্য নয়। (৮) কলাগাছের জড় খেয়ে নষ্ট করে জিরে, তেমনি মোমিনের ঈমান নষ্ট করে ভন্ড পীরে। (৯) বক দিয়ে যেমন বক ধরার ফাঁদ তৈরী করে, তেমনি মুসলমান দিয়ে ইয়াহুদ-খ্রিস্টানরা মুসলিম ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। (১০) সুচতুর ভাবে মওদুদী সাহেব হযরত সাহাবা আজমাঈন (রা)-এর উপর কালিমা লেপন করেছে। (১১) কারও কাছ থেকে তাবিজ ধারণ করার চাইতে নিজে আমল করা উত্তম। (১২) নিকটের কেউ মুরিদ হওয়ার জন্য আসলে বলতেন, আডোইমা দুধ-ভাত গলাইমা কাটা তেনা পাইতায় ফিরাকির বাটা। (১৩) মেহমানকে সাথে নিয়া খাও, না হয় মেহমান কে আগে খাওয়াও। (১৪) যে গাছে ফল ধরে সে গাছটি যেমন মাথা নুয়ে গম্ভীর হয়ে থাকে, তেমনি গুণবান ব্যক্তির জন্য ধৈর্য ও গম্ভীর থাকা প্রয়োজন। (১৫) দাঁতের গুড়ায় কোন জিনিস আটকালে জিহ্বার যেমন বিরাম নেই, তেমনি প্রবেশ করা শত্র“ না হঠানো পর্যন্ত মুমিনের আরাম নেই। (১৬) ওয়াজের মাহফিলে শ্রোতা ওয়াইজের সম্মুখে মনযোগ সহকারে না বসিলে ওয়াজ অন্তরে স্থান পায় না। (১৭) যদি ঝড়-বৃষ্টির কারণে মসজিদে জামাতে নামায পড়তে না পার, তবে বিবি-বাচ্চাদের নিয়া হলেও জমাতে নামায আদায় করিও। (১৮) তোমরা রব কে ভয় কর, র‌্যাব কে নয়। (১৯) যা যায় গাঙ্গের ভাটি, যা থাকে লোহার আটি। (২০) ফরয নামায আদায়ের পাশাপাশি নফল নামাযও পড়। (২১) সর্বদা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা কর।
কারামত ঃ ‘কারামতে আউলিয়া হাক্কুন’ কথাটির যথার্থতা মিলে শায়খে গাজীনগরীর জীবনে। তাঁর জীবদ্দশায় অসংখ্য কারামত ঘটেছে বলে জনশ্র“তি রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৪০১ হিজরীতে আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত দস্তারবন্দী মহাসম্মেলনে বৃষ্টি বন্ধ হওয়া, দণি সুনামগঞ্জের নোয়াখালী গ্রামের পশ্চিমের মাঠে ওয়াজের বদৌলতে যাত্রাগান বন্ধ হওয়া, দিরাইয়ের কাইমা গ্রাম সংলগ্ন হাওরে তুফানের কারণে নৌকা ডুবির আশংকার পর দোয়ার বরকতে ঝড়-বৃষ্টি ও তুফান বন্ধ হওয়া, সুনামগঞ্জ থেকে জামালগঞ্জ যেতে গভীর রাতে অনাকাংকিত ভাবে নৌকার সন্ধান পাওয়া, দিরাইয়ের ভাটিপাড়া গ্রামে তাঁর জিকিরের আওয়াজে গ্রামের লোকজন অসংখ্য কন্ঠের জিকির শোনা ইত্যাদি।
ইন্তেকাল ঃ আশিকে রাসূল (সা), খলিফায়ে মাদানী (রহ) আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী (রহ) জীবনে ৪ বার হজ্বে গমন করেন। ৪র্থ বার হজ্বে গমনকালীন সময়ে ১৪ নভেম্বর ২০০৮ ইংরেজী রোজ শুক্রবার রাত ৪টা ২৫ মিনিটে হজ্ব সফরে রওয়ানা হন। সৌদি আরবে পৌঁছে আশিকে রাসূল (সা) হযরত মাওলানা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী (রহ) প্রথমে যান হুজুর পাক (সা)-এর রওজা যিয়ারতে। সেখানে ৯ দিন অবস্থান করে পুনরায় ফিরে আসেন পবিত্র মক্কাতুল মোকাররমায়। খোদায়ী অমোঘ বিধান অনুযায়ী মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে ২রা ডিসেম্বর ২০০৮ ইংরেজির সোমবার দিবাগত রাতে নুযূলে রহমতের সময় (স্থানীয় সৌদিআরব সময়) ৩টা ৫ মিনিটে এহরামের অবস্থায় কালিমায়ে তায়্যিবা ও শাহাদত পাঠান্তে আবে জমজম পান করে মাওলায়ে হাকীকির ডাকে সাড়া দেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টা ৫ মিনিটে ফজরের নামায পড়েই এ খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। খবরের সত্যতা যাছাই করতে অনেককে অনেক স্থানে ফোন করতে দেখা গেছে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র-শিক, ভক্ত-অনুরক্তদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ক্বাবা শরীফের আঙ্গিনায় প্রায় অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার বাদ নামাযে আছর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। নামাযে জানাযায় ইমামতি করেন হরম শরীফের ইমাম আল্লামা আল-শায়েখ ফয়ছল আল গাজ্জাওয়ী। পরে জান্নাতুল মুয়াল্লার ৮১/১৬ নম্বর কবরে তাঁকে দাফন করা হয়।
উপসংহার ঃ ‘ইন্নামাল আ‘মালু বিল খাওয়াতিম’-এর উপর অটল-বিশ্বাস স্থাপনকারী বুযূর্গ অবশেষে হজ্বের সময় ইহরাম অবস্থায় মক্কাতুল মুকাররমায় ইন্তেকাল, অর্ধকোটি মানুষের উপস্থিতিতে নামাযে জানাযা, হরম শরীফের ইমাম মহোদয়ের ইমামতি, সর্বোপরি জান্নাতুল মুয়াল্লায় তাঁর দাফন; এ সকল বিষয় নিয়ে হাদীসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে সত্যিই খলিফায়ে মাদানী আল্লামা আব্দুল হক শায়খে গাজীনগরী মাদফুনে মাক্কী (রহ) একজন ওলিয়ে কামেল হিসেবে নি:সন্দেহে বিবেচিত। প্রকৃত পে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে যেমনি গবেষণা প্রয়োজন, তেমনি তাঁর জীবন থেকে শিা গ্রহণ করে অনুস্মরণ ও অনুকরণীয় দিকগুলো বাস্তবায়ন করা আমাদের একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আর তাতেই আমাদের পূর্বসূরীদের রেখে যাওয়া আমানত ও পরিশ্রম স্বার্থক হবে। তাঁদের আত্মা খুশি হবে এবং রুহানী ফয়েজ দ্বারা আমাদের জীবন পরিপূর্ণ ও উজ্জ্বল হবে। সুতরাং বুযুর্গদের ইতিহাস চর্চা ও বাস্তবায়ন করতে যেন আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদেরকে তৌফিক দান করেন। আমিন!


Share with :

Facebook Twitter